রাঢ় বাংলার অম্বুবাচী ব্রত:অম্বরের প্রার্থনায় এক অমরত্বের গান

                             (আলোকচিত্র : অভিজিৎ গরাই)
পল্লব গোস্বামী: আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে, টুপটাপ বৃষ্টি। মেঘে মেঘে বিদ্যুৎ। প্রথম কদমফুল। শাস্ত্র ও পুরাণ মতে, এই সময়ই মা ধরিত্রী ঋতুমতী হন। বর্ষার জলকণার সাথে, সুজলা-সুফলা-শস্যশ্যামলা হয়ে ওঠেন মা প্রকৃতি। শক্তিময়ীর এই রজস্বলা দশাকে কেন্দ্র করেই উদযাপিত হয় 'অম্বুবাচী'। তবে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া- তথা রাঢ়বঙ্গে এই পরবের প্রকৃতি সামান্য ভিন্ন।

 সূর্য, রাশিচক্রের আদ্রা নক্ষত্রে প্রবেশ করলে বর্ষাকাল শুরু হয়। লোকবিশ্বাস অনুসারে, আষাঢ় মাসের সাত তারিখে মৃগশিরা নক্ষত্রের তিনটি পদ শেষ হলেই পৃথিবী মা রজঃস্বলা হন।

প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, এই সময় পল্লী বাংলার চাষিরা, কৃষিকার্য বন্ধ রাখেন। জমিতে কোনও রকম লাঙল চালানো, জমি খোঁড়া বা সমস্ত ধরনের কৃষি কাজ থেকে বিরত থাকা হয়। এমনকি, লাঙলের সাথে যাতে করে মাটির স্পর্শ না লাগে, এই কারণে লাঙল, বাড়ির উঠোনে তুলসী মঞ্চের ওপরে রেখে দেওয়া হয়। তিন দিন কোনও মাঙ্গলিক কাজ করা হয় না। তবে কিছু কিছু জায়গায়, “লায়া”- নামক এক বিশেষ সম্প্রদায়, বটতলায় বা অশ্বত্থ গাছের নীচে প্রকৃতি পূজা করেন। 

আম, জাম, নতুন বর্ষার খেজুর সহযোগে ভোগ লাগানো হয়। জমিতে বীজ ফেলার কাজ সারা হয়ে থাকলেও, অম্বুবাচী ব্রত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ধান লাগানোর কাজ শুরু হয় না। আর ধান লাগানোর জন্য জলের প্রয়োজন। বাইদ, বহাল, কানালির জমিগুলি যেন বর্ষার প্রার্থনায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর, অল্প একটু বিশ্রামের অপেক্ষায় থাকে চাষিরাও। রাঢ়বঙ্গের অম্বুবাচী তাই, একদিকে যেমন প্রকৃতি বন্দনা; অন্যদিকে তেমন ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায়, আগামীর জন্য সবুজ ফসলের স্বপ্ন বোনার দিন।
Tags

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.